বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ন
২০১২ সালে তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলওয়ে স্টেশন নতুন রেলপথ তৈরি হলে এই ট্রেনটিও বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থেকে চলাচল শুরু করে। তখন থেকে এই ঘাট লাইনটি অব্যবহৃত রয়েছে। এছাড়া জগন্নাথগঞ্জ পুরাতনঘাট রেলস্টেশনটি বঙ্গবন্ধু সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত করে স্থানান্তরি হলেও যমুনা নদীরপাড়ে অপর রেলস্টেশন, স্লিপার, রেললাইন পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আর এ সুযোগে আস্তে আস্তে রেলের জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থানে স্থাপনাও গড়ে তুলতে শুরু করলেও পুরাতনঘাটে স্টেশনটি আজো জঞ্জালের মতো পড়ে আছে। অনেক জায়গায় রেললাইন মাটির নিচে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। স্লিপারগুলো আগেই চলে গেছে চুলার পেটে।
জানা গেছে, জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাটের বেশকিছু অংশ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক দিন ধরে পড়ে থাকার কারণে নানা জঞ্জাল ও আস্তে আস্তে দখলে পরিণত হচ্ছে। রেললাইনের ওপরে গড়ে উঠছে দোকানপাট।
বৃটিশ শাসনামলে ১৮৯৯ সালে জামালপুর থেকে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও ১৯৩৮ সালে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ ঘাট দিয়ে যমুনা নদীতে রেল ফেরি সার্ভিস চালু হয়। পরে ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার ফলে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে সিরাজগঞ্জ ঘাটের সঙ্গে ফেরি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে। বঙ্গবন্ধু সেতু লিঙ্ক রোডে ট্রেন চলাচল শুরু হলে সরিষাবাড়ির আওনা ইউনিয়নের দৌলতপুর ফাজিল মাদরাসার পেছন থেকে ১৫ কিলোমিটার রেলের পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
অখণ্ড ভারতবর্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপনের জন্য জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলার জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটে যাত্রী পারাপারের জন্য ফেরি চালু হয়। পশ্চিমবঙ্গ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া এবং এদিকে ঢাকা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং সিলেট, গৌহাটি এবং বার্মার সঙ্গে রেলপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল জগন্নাথগঞ্জ এবং বাহাদুরাবাদ ঘাট। সেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই অল্প খরচে রেলওয়ে ওয়াগনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল, সার, কয়লা, কৃষিজাতপণ্য, রড-সিমেন্ট, পাথরসহ নির্মাণ সামগ্রী ও অন্যান্য মালামাল অতি সহজে আনা-নেওয়া করা যেত এ ঘাট দিয়ে।
জগন্নাথগঞ্জঘাটের অ্যাড. মতিয়র রহমান তালুকদার স্টেশনের বুকিং সহকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগের মতো আর এ ঘাটের জৌলুস নেই। এ ঘাট থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে কয়েকটি মালবাহী বগিতে বিভিন্ন মালামাল যেত। এখন আর তেমন কিছু যায় না।
শতবর্ষের পুরোনো এ ঘাট দিয়ে কত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী, কত ফেরিওয়ালা, হকার, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, জেলখানার কয়েদি কিংবা নববিবাহিত দম্পতি পার হয়েছে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। ঐতিহাসিক ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস ট্রেনটি একসময় জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলাচল করত। বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হলে তারাকান্দি থেকে একটি লাইন জগন্নাথগঞ্জকে বাইপাস করে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে বর্তমানে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে আর কোনো ট্রেন চলাচল করে না। জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে এখন আর লঞ্চ নেই, ফেরি নেই, ঐতিহাসিক সেই পুরাতন ঘাটটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে বাংলার রেল ইতিহাস যতদিন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের নাম মুছে যাবে না।
পুরাতন স্টেশনটি আজো পড়ে আছে জঞ্জালের মতো।আশপাশের জায়গাগুলো চলে গেছে দখলকারীদের কব্জায়। শুধুই স্মৃতি হিসেবে রয়েছে মরিচা ধরা ছোট্ট স্টেশনের অংশবিশেষ।
এই বাজারের আবুল হোসেন বলেন, সরকার যার কাছ থেকে রেলের জন্য জায়গা নিয়েছিল- তারই আত্মীয়-স্বজনেরা দখলে নিয়ে স্থাপনা গড়ছে।
একই অবস্থা দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ নৌ-ঘাটের। এখন আর স্টিমার নজরে পড়ে না বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ রোডে। ঘাটের অসংখ্য স্থানে রেললাইনের নিচের মাটি সরে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, কাঠের স্লিপার পচে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় রেলপাত নষ্ট হয়ে গেছে। সরিয়ে নেয়া হয়েছে রেলস্টেশনের টিনের তৈরি ঘর ও অন্য সরঞ্জামাদি। যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তাও অযত্নে, অবহেলায় নষ্টের পথে।
যমুনার পশ্চিম পাড়ের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুরের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জামালপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে বাহাদুরাবাদ থেকে ফুলছড়ি ঘাট রুটে আবারো ফেরি ও ট্রেন চলাচলের দাবি জানিয়েছেন রেলওয়ে যাত্রীরা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩৮ সালে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ ঘাট দিয়ে যমুনা নদীতে রেল ফেরি সার্ভিস চালু হয়। রেলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় যমুনা নদীর ওপর দিয়ে রেলযাত্রী ও পণ্যবাহী ওয়াগন পারাপার। পরে নিয়মিত ফেরি চলাচল করলেও ২০০৫ সালে যাত্রীবাহী ফেরি পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে যমুনা নদীর নাব্যতা সংকটে বাহাদুরাবাদ ঘাটটি ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি থেকে সরিয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ি হলকার চরে বাহাদুরাবাদে স্থানান্তর করা হয়।
আরো জানা যায়, দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত নতুন করে রেলপথ নির্মাণ করা হয়। বাহাদুরাবাদ ঘাট নতুন জায়গায় স্থানান্তর করার পরে পুনরায় ট্রেন সার্ভিস চালুর কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত এ রুটে ট্রেন চালু হয়নি। সঠিক তদারকি না থাকায় নষ্ট হচ্ছে রেলের যন্ত্রাংশ, চুরি হয়ে যাচ্ছে রেলপাত, অসংখ্য স্লিপারসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ। আর বেদখল হয়ে যাচ্ছে রেলের কোটি কোটি টাকার জমি। পুরাতন বাহাদুরাবাদ ঘাট এখন নদীভাঙন পরিবারও ভূমিহীনদের আশ্রয়স্থল।
দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আব্দুল বাতেন বলেন, ২০০৪ সালে ঢাকা-দিনাজপুরগামী আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীবাহী ফেরি চলাচল বন্ধ হয়। ২০০৫ সালে বন্ধ হয় তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীবাহী ফেরি চলাচল। ২০০৭ সালে দেওয়ানগঞ্জের হলকারচরে বাহাদুরাবাদ ঘাট স্থানান্তরের পরে কিছু দিন মালবাহী ফেরি চলাচল করলেও ২০১৪ সালের পর থেকে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজ্জাক বলেন, ফেরি ও ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এলাকার হাজারো কর্মজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিনই চুরি হয়ে যাচ্ছে রেলওয়ের লোহার পাত।
দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ের উর্ধ্বতন উপ-প্রকৌশলী (পথ) মোহাম্মদ আবু সাঈদ হাসান বলেন, বাহাদুরাবাদ ঘাটে রেলওয়ের সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দুইজন সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত দেখভাল করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তদারকি আরো বাড়ানো হবে।